আলোকপাত

এসডিজি অর্জনে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা

এসডিজির পূর্বসূরি সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম অগ্রদূত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি আজ আর অজানা নয়। দারিদ্র্য নিরসন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষায় জেন্ডার সমতা আনয়ন, নবজাতক ও পাঁচ বছরের নিচে

এসডিজির পূর্বসূরি সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম অগ্রদূত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি আজ আর অজানা নয়। দারিদ্র্য নিরসন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি এবং প্রাথমিক মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষায় জেন্ডার সমতা আনয়ন, নবজাতক পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যু হার মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণে উন্নতি, সংক্রামক রোগের প্রকোপ কমিয়ে আনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটিয়েছে। বস্তুত চিত্তাকর্ষক কৃতিত্বের সূত্র ধরে বৈশ্বিক পর্যায়ে ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডা প্রস্তুতি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ কার্যকর অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য, জাতিসংঘে বাংলাদেশের পেশকৃত প্রস্তাব ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রস্তাবের মধ্যে বিস্ময়কর মিল ছিল এবং বিশেষত বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রস্তাবিত ১১টি অভীষ্টের মধ্যে নয়টি অভীষ্ট টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (ইউএন, এসডিজি) সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে মিলে যায়। অন্যান্য অভীষ্টের মধ্যে সরাসরি সাদৃশ্য না থাকলেও ওইগুলো বাংলাদেশের প্রস্তাবে বিভিন্ন অভীষ্টের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এভাবেই আগামী দেড় দশকের মধ্যে (২০১৬-২০৩০) বিশ্বকে যেসব টেকসই উন্নয়ন সমস্যা নিয়ে সংগ্রাম করতে হবে, তা বাংলাদেশের অনুভূতি ভাবনায় এসডিজি প্রণয়নকালেই জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়।

অনেকটা কাকতালীয়ভাবে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (২০১৬-২০৩০) সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১৬-২০২০) অভিযাত্রা একই সময়ে ঘটে। ফলে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করে এসডিজি বাস্তবায়নে শুরুতেই বাংলাদেশ প্রথম সারিতে অবস্থান করে নেয়ার সুযোগ হাতে পেয়ে যায়। বস্তুত ১৭টি অভীষ্টের সব কয়টিই সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তার মধ্যে বিষয়বস্তুগতভাবে ১৪টি (৮২%) অভীষ্ট সম্পূর্ণভাবে এবং তিনটি (১৪, ১৬ ১৭ নং অভীষ্ট) আংশিকভাবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এতে পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য, এসডিজির সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মন্ত্রণালয় বিভাগগুলোর দায়িত্ব ম্যাপিং, ডাটা ঘাটতি বিশ্লেষণ, জাতিসংঘে প্রথম দ্বিতীয় ভলান্টারি ন্যাশনার রিভিউ প্রতিবেদন পেশ, প্রথম দ্বিতীয় এসডিজি অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রণয়ন, এসডিজি অর্থায়ন কৌশল, প্রশিক্ষণ হ্যান্ডবুক, এসডিজি-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন সম্মেলন এবং পরিবীক্ষণ মূল্যায়ন কাঠামোসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দলিল প্রণয়ন করছে; যা জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসডিজি আত্তীকরণের প্রাসঙ্গিকতা এখানেই যে এই ফ্ল্যাগশিপ উন্নয়ন দলিল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই এসডিজি বাস্তবায়ন নিশ্চিত হতে পারে।

এসডিজি বাস্তবায়নের শেষ দশকের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দেশ যখন উন্নয়ন অগ্রযাত্রার সম্মুখে, ঠিক সে সময়ে বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ মহামারীর কারণে আমাদের এই নিরবচ্ছিন্ন আর্থসামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া কিছুটা হলেও বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। মহামারীর কারণে একদিকে যেমন বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের হার সাময়িক বৃদ্ধি পেয়েছে; অন্যদিকে অর্থনীতি উত্থানের ধীরগতির কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হার হ্রাস পেয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সময়োচিত সুযোগ্য নেতৃত্বের ফলে আমরা কভিড-১৯ সৃষ্ট অর্থনৈতিক অচলাবস্থা অনেকাংশে কাটিয়ে উঠলেও অর্থনীতির চাকা পূর্ণ পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটপূর্ণ সময়ে সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে বিধৃত পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার গুণগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধনকল্পে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (জুলাই ২০২০-জুন ২০২৫) প্রণয়ন করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প ২০৪১-এর আলোকে প্রণীত দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ যে চারটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে, তার প্রথমটি হলো অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। তাই দেশের আর্থসামাজিক পরিবেশগত উন্নয়নে এবং কভিড পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদানের ক্ষেত্রে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল। এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে রূপকল্প ২০৪১-এর ভিত তৈরি, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) লক্ষ্যগুলো যথাসময়ে অর্জন এবং বাংলাদেশ -দ্বীপ পরিকল্পনার লক্ষ্যগুলো অর্জিত হবে। এছাড়া কভিড-১৯ মহামারীর কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করার লক্ষ্যে গৃহীত কৌশল অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সফলভাবে আত্তীকরণ করা হয়েছে।

এসডিজি বাস্তবায়নের অন্যতম মূলমন্ত্র হলো সমগ্র সমাজ বা Whole of Society সংশ্লিষ্ট পদ্ধতি। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের শুরু থেকেই সমগ্র সমাজ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা দলিল প্রণয়নের বিভিন্ন স্তরে সরকারি, বেসরকারি, এনজিও, সিভিল সোসাইটি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী, একাডেমিয়া, সংসদ সদস্য এবং জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া দলিলটির খসড়া প্রণয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে এর ওপর সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) কর্তৃক বাংলাদেশের স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত অর্থনীতিবিদ প্যানেল-এর মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু তা- নয়, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি আরো কর্মোপযোগী করে তোলার লক্ষ্যে এটি চূড়ান্তকরণের আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে আমরা বলতে পারি এসডিজির মূলমন্ত্রের ওপর অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে এবং এসডিজি বাস্তবায়নের পথে এটি দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা।

এসডিজির সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসডিজির সব অভীষ্টকে ধারণ করা হয়েছে। শুধু তা- নয়, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গৃহীত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিবীক্ষণ মূল্যায়নের লক্ষ্যে প্রণীত ডেভেলপমেন্ট রেজাল্টস ফ্রেমওয়ার্কে উল্লিখিত ১০৪টি সূচকের মধ্যে ৬৬টি সূচক এসডিজি থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে এসডিজিকে ধারণ করার দিক থেকে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আগের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা থেকে আরো এগিয়ে আছে।

এসডিজির সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ এসডিজি অর্জনে বেশকিছু সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যার অনুপাত ২০ দশমিক ৫০ শতাংশ (২০১৯), যা ২০১৬ সালে ২৪ দশমিক ৩০ শতাংশ ছিল। একই সময়ে সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী আওতার অন্তর্গত জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২৮ দশমিক ৭০ শতাংশ (২০১৬) থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫৮ দশমিক ১০ শতাংশে (২০১৯) পৌঁছেছে। যদিও এর মধ্যে বাদ পড়ে যাওয়া ভুল অন্তর্ভুক্তির সমস্যাও রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতার ব্যাপকতা ২০১৬ সালে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ২০২০ সালে ১৩ শতাংশে উপনীত হয়েছে। কমেছে খর্বতা কৃষতা। স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ কিছু ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। একদিকে যেমন মাতৃমৃত্যু হার (প্রতি লাখে ১৬৫ জন), নবজাতকের মৃত্যুহার (প্রতি হাজারে ১৫), যক্ষ্মা (প্রতি লাখে ২২১ জন) ম্যালেরিয়ায় (প্রতি হাজারে . জন) আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে প্রসব (৫৯ শতাংশ, ২০১৯) এবং আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের অনুপাত (৭৭.৪০ শতাংশ, ২০১৯) ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাথমিক মাধ্যমিক শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এরই মধ্যে জেন্ডার সমতা অর্জন করেছে। তাছাড়া নিরাপদ পানি স্যানিটেশন সুবিধা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সাশ্রয়ী দূষণমুক্ত জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা অগ্রগতি অর্জন করেছি। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর অনুপাত ৯৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আমরা আশা করছি, ২০২১ সাল নাগাদ দেশের সব জনগোষ্ঠীকে সুবিধার আওতায় আনতে সক্ষম হব। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেছি। মাথাপিছু প্রকৃত বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০১৯ অর্থবছরে দশমিক ৯১ শতাংশে পৌঁছেছে; বেড়েছে প্রতি কর্মিজনে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার। ব্যাংক ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান অথবা মোবাইলে আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হিসাবধারী পূর্ণবয়স্ক (১৫ বছর তদূর্ধ্ব) জনগোষ্ঠীর অনুপাতও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প, উদ্ভাবন অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে ম্যানুফ্যাকচারিং মূল্য সংযোজনের হার ২০১৫ সালের ২০ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ২১ শতাংশে এসেছে। প্রযুক্তির ভিত্তিতে মোবাইল নেটওয়ার্ক আওতাভুক্ত জনসংখ্যার অনুপাতও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বনাঞ্চলের পরিমাণ ২০১৫ সাল থেকে কিছুটা বেড়েছে (১৪.৪৭ শতাংশ, ২০১৮); বেড়েছে মোট সামুদ্রিক এলাকার তুলনায় সংরক্ষিত এলাকার বিস্তৃতি (.২৭ শতাংশ, ২০২০) শান্তি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অংশীদারিত্ব সৃষ্টির বিষয়ে যেসব অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, তার মধ্যে পরিকল্পিতভাবে খুন হওয়া মানুষ এবং মানব পাচারের হার হ্রাস, জন্মনিবন্ধনের হার বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী ভার আরোপিত (ওয়েইটেড) শুল্ক-গড়ের পরিমাণ হ্রাস উল্লেখযোগ্য।

২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সংশ্লিষ্ট খাতগুলোয় এসডিজিকে আগের তুলনায় আরো শক্তিশালীরূপে ধারণ করা হয়েছে। এবার পরিকল্পনা দলিলের খাতভিত্তিক কৌশল নির্ধারণে এসডিজির প্রতিফলন সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করছি।

() অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলে দারিদ্র্য বৈষম্য দূরীকরণ কৌশল আলোচনার ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো এসডিজির অন্তর্ভুক্ত বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক ব্যবহার করা হলে বাংলাদেশ দ্রুত অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য সমাধানে অগ্রগতি লাভ করবে;

() অভীষ্ট ১০ (অসমতা দূরীকরণ) অর্জনে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি (জিডিপির দশমিক শতাংশ), স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাতে যথাক্রমে জিডিপির শতাংশ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি অনুমোদন করা হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় ব্যয় বৃদ্ধি প্রাথমিক মাধ্যমিক পর্যন্ত বৃত্তি সর্বজনীন করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে

() এসডিজি অভীষ্ট ১৬ (শান্তি, ন্যায়বিচার কার্যকর প্রতিষ্ঠান বা সুশাসন)-কে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদেরকে জনগণের জন্য ন্যায়বিচার লাভের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ সব পর্যায়ে কার্যকর জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে জোর দেয়া হয়েছে;

(জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জনে এসডিজিকে ধারণ করে বিদ্যুৎ খাতের জন্য সংশোধিত পাওয়ার জেনারেশন প্ল্যান ২০৩০ প্রণয়ন করা হয়েছে;

() জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ডিজিটাল পরিষেবার আধুনিকীকরণের ওপর অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জোর দেয়া হয়েছে, যাতে এসডিজি অর্জনের পথ সুগম হবে;

() দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের আলোকে পরিবেশগত নানা বিষয় বিবেচনাপূর্বক এসডিজি-সংক্রান্ত কৌশল বর্ণনা করা হয়েছে পরিকল্পনা দলিলে;

() চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নসংক্রান্ত নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে;

() যুবসমাজ-সংক্রান্ত এসডিজি (বিশেষত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত) অর্জনের লক্ষ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যুবদের উন্নয়নের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে;

() এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ১১. মোতাবেক বিশ্বের সাংস্কৃতিক প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ নিরাপত্তা প্রচেষ্টা জোরদার করার লক্ষ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৌশল কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে;

(জেন্ডার সমতা অর্জন নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে এসডিজির আলোকে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কর্মকৌশল বর্ণনা করা হয়েছে;

() পরিবেশগত দুর্যোগ মোকাবেলায় এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ -দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়নের নিমিত্ত অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল ঘোষণা করা হয়েছে;

() ডিজিটাল ইনোভেশন প্রবর্তনের লক্ষ্যে এসডিজির আলোকে কর্মপরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়;

() খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পুষ্টিহীনতা দূরীকরণের লক্ষ্যে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়, যাতে সহজেই এসডিজির উদ্দেশ্যগুলো অর্জিত হয়; এবং

() কভিড-১৯ মহামারীর কারণে যাতে এসডিজিসহ সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না হয়, তাই -সংক্রান্ত যাবতীয় কৌশল পন্থাও সহায়ক কর্মসূচি পরিকল্পনা দলিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

উপরের আলোচনা থেকে এটি সহজেই অনুমেয় যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টকে গভীরভাবে আত্তীকরণ করা হয়েছে। ফলে আমরা বলতে পারি সরকারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়নের মাঝেই এসডিজির সাফল্য নিহিত রয়েছে। পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে বার্ষিক বাজেট প্রণয়নে এই পরিকল্পনার যথার্থ প্রতিফলন তথা আত্তীকরণ। প্রতিটি মন্ত্রণালয়/বিভাগকে পরিকল্পনামাফিক লক্ষ্য অর্জনে প্রকল্প/কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তবে সাফল্য নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সরকারি, বেসরকারি, এনজিও, সিভিল সোসাইটি, উন্নয়ন সহযোগীসহ সমাজের সব শ্রেণীর জনগণের একনিষ্ঠ সহযোগিতা অংশগ্রহণ এবং পরামর্শ প্রদান।

     

. শামসুল আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ

সদস্য (সিনিয়র সচিব), সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন

 

আরও