বরেন্দ্রী উপভাষা
| বরেন্দ্রী বাংলা | |
|---|---|
| রাজশাহী-বাংলা | |
| দেশোদ্ভব | বাংলাদেশ, ভারত |
| অঞ্চল | রাজশাহী বিভাগ, মালদা বিভাগ |
মাতৃভাষী | |
ইন্দো-ইউরোপীয়
| |
| বাংলা বর্ণমালা | |
| ভাষা কোডসমূহ | |
| আইএসও ৬৩৯-৩ | – |
| গ্লোটোলগ | nort2658 (Northern Bengali)[১]rajs1238 (Rajshahi)[২] |
বরেন্দ্রী উপভাষা বা বরেন্দ্রী বাংলা হচ্ছে বাংলাদেশ এবং ভারতের পদ্মা ও মহানন্দা উপত্যকা অঞ্চল জুড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের ব্যবহৃত বাংলা ভাষার একটি উপভাষা। এই উপভাষার একটি বিশেষ সুর আছে। যার কারণে উপভাষাটি সমগ্র বঙ্গে বেশ জনপ্রিয়। [৩] ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা গানে এই উপভাষা ব্যবহার হয়।
বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]এই উপভাষায় বিশেষ এক ধরনের সুর আছে। যার কারণে এটি শুনতে বেশ মিষ্টি লাগে। তাছাড়া বরেন্দ্রী বাংলা প্রমিত বাংলার মতোই বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।
ধ্বনিতাত্বিক ও রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]- বরেন্দ্রী উপভাষার সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য অভিশ্রুতি। যেমন-
- কহিয়া > কহে, করিয়া > কইরে, বসিয়া > বইস্যা, আঁকিয়া > আঁইকে, ইত্যাদি হল অভিশ্রুতি জনিত পরিবর্তন।
- ‘এ’ অনেকসময় ‘অ্যা’ উচ্চারিত হয়। যেমন — এক > অ্যাক, কেমন > ক্যামন, করেছে > কর্যাছে ইত্যাদি।
- নাসিক্যীভবন বরেন্দ্রী উপভাষায় খুবই স্পষ্ট। যেমন — ঙ: অঙ্কন > আঁকা, কঙ্কন > কাঁকন, কঙ্কর > কাঁকর, পঙ্ক্তি > পাঁতি, পঙ্ক > পাঁক, ভঙ্গ > ভাঁজ, ঝাঙ্ক > ঝাঁকা ও শঙ্খ > সাঁক; ঞ: অঞ্চল > আঁচল, অঞ্জলি > আঁজলা, পঞ্চ > পাঁচ, পঞ্জর > পাঁজর, হঞ্জি > হাঁচি, কুঞ্চিকা > কুঁচ, কুঞ্চিত > কোঁচানো, গঞ্জিকা > গাঁজা ও বঞ্চ > বাঁচা; ণ: কণ্টক > কাঁটা, কণ্টকী > কাঁঠাল, চণ্ডাল > চাঁড়াল, ভণ্ড > ভাঁড়, ভাণ্ডার > ভাঁড়ার, শুণ্ড > সুঁড়, ষণ্ড > সাঁড়, হণ্টন > হাঁটা, দণ্ড > দাঁড়ানো, খণ্ড > খোঁড়া, কুণ্ডিকা > কুঁড়ি, হণ্ডিকা > হাঁড়ি, গুণ্ড > গুঁড়া, বণ্টন > বাঁটা, কুণ্ড > কুঁড়, বণ্ড > বাঁড়া ও গণ্ড > গাঁড়; ন: অন্ধকার > আঁধার, ক্রন্দন > কাঁদা, গ্রন্থন > গাঁথা, চন্দ্র > চাঁদ, দন্ত > দাঁত, বন্ধ > বাঁধা, বৃন্ত > বোঁটা, সন্ধ্যা > সাঁজ, স্কন্ধ > কাঁদ, রন্ধন > রাঁধা, উন্দুর > ইঁদুর ও সিন্দূর > সিঁদুর; ম: কম্পন > কাঁপা, গ্রাম > গাঁ, চম্পক > চাঁপা, ঝম্প > ঝাঁপ, ধূম > ধোঁয়া, সমর্পণ > সঁপা, গুম্ফ > গোঁপ, বাম > বাঁ ও ক্ষুম্প > খোঁপা;ং: বংশ > বাঁস, বংশী > বাঁসি, সংক্রম > সাঁকো, হংস > হাঁস, কাংস্য > কাঁসা ও সংতরণ > সাঁতার; জ্ঞ: জ্ঞান > গ্যাঁন, সংজ্ঞা > সংগাঁ, ইত্যাদি; ক্ষ্ম: যক্ষ্মা > জক্খাঁ, লক্ষ্মণ > লক্খোঁন্, ইত্যাদি; শ্ম: শ্মশান > সঁসান; ষ্ম: গ্রীষ্ম > গিস্সোঁ; স্ম: স্মৃতি > স্রিঁতি, স্মরণ > সঁরোন, ইত্যাদি। এছাড়া সতোনাসিক্যীভবনও দেখা যায়, যেমন — পুস্তক > পুথি > পুঁথি, কাচ > কাঁচ, পেচক > প্যাঁচা, ইত্যাদি।
- বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শব্দের প্রথমে ‘ন’ থাকলে ‘ল আর ‘ল’ থাকলে ‘ন’ হয়।
- যেমন — নেওয়া→লেওয়া, নীল→লিল; লুচি→নুচি, লেবু→নেবু, ইত্যাদি।
- কোনো শব্দের আদিতে শ্বাসাঘাত হলে সেই শব্দের অন্তে অবস্থিত মহাপ্রাণ ধ্বনি স্বল্পপ্রাণ ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়। যেমন — দুধ > দুদ, মাছ > মাচ, বাঘ > বাগ, ইত্যাদি। যেকোনো শব্দের আদিতে মহাপ্রাণ হতে পারে, কিন্তু এর পরের ধ্বনি অল্পপ্রাণ হয়। যেমন — জাম > ঝাম, বেরোনো > ভেরোনো, ইত্যাদি।
- শব্দের পরের অঘোষধ্বনি ঘোষধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়। যেমন — কাক > কাগ, বুঝতে > বুইজদে, বুঝছে > বুইজঝে, ইত্যাদি।
- বরেন্দ্রী উপভাষায় কিছু শব্দের আদিতে অকারণে ‘র’ এর আগম ও লোপ। যেমন — রাম > আম , রস > অস, ইত্যাদি।
- বরেন্দ্রী উপভাষায় কিছু জেলা ব্যতিত (পাবনা, সিরাজগঞ্জ) সব জেলাতেই সবসময় ‘শ’, ও ‘স’-কে স [s] ধ্বনিতে উচ্চারণ করা হয়। ‘ষ’ ট-বর্গীয় ধ্বনির সঙ্গে সংযুক্ত থাকলেই শুধু শ [ʃ] উচ্চারিত হয়, নইলে এটিতেও ‘স’ উচ্চারিত হয়।
- স্থানভেদে ‘ক’ বা ‘কে’ উভয় বিভক্তির ব্যবহার গৌণ কর্ম কারকে দেখা যায়। যেমন— আমাকে > হামাক/হামাকে, তাকে > তাক/তাকে/ওকে, ইত্যাদি।
- অধিকরণ কারকে ‘এ’ বা ‘অ্যা’ এবং ‘ত’ বা ‘তে’ বিভক্তি হয়। যেমন- ঘরে, মাটিতে/মাটিত ইত্যাদি।
- কর্তৃকারকের বহুবচনে ‘গুনো’ বা ‘গুনা’এবং অন্য কারকের বহুবচনে ‘দের’ বিভক্তির প্রয়োগ।
- যেমন — মেয়েগুনো, পাখিগুনা, লোকেদের, ইত্যাদি।
- বরেন্দ্রীতে উত্তম পুরুষের সাধারণ অতীতে ‘নু’ আর নিত্যবৃত্ত অতীতে কিছু এলাকায় ‘তুং’ প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়। যেমন — করলাম > কন্নু, গেলাম > গেনু, করতাম > কত্তুং, যেতাম > যেতুং, ইত্যাদি।
- সামান্য অতীত বােঝাতে প্রথম পুরুষের অকর্মক ক্রিয়াপদে ‘ল’ বিভক্তি এবং সকর্মক ক্রিয়াপদে ‘লে’ বিভক্তির প্রয়ােগ। যেমন — সে গেল; সে বইটা দিলে; ইত্যাদি।[৪][৫]
- না-বোধক অব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘না’ বা ‘নেই’ হলে ‘লাই’ আর ‘নয়’ হলে ‘লয়’-এ পরিবর্তন হয়ে যায়।
- ঘটমান কালে ‘চ্ছি’ থেকে ‘ইচি’, ‘চ্ছে’ থেকে ‘ইচে’, ‘চ্ছেন’ থেকে ‘ইচেন’, ‘চ্ছ’ থেকে ‘ইচ', ‘চ্ছিস’ থেকে ‘ইচিস’ হয়ে যায়। যেমন — হচ্ছি > হইচি, করাচ্ছে > করাইচে, সরাচ্ছেন > সরাইচেন, দিচ্ছ > দিচ, বোঝাচ্ছিস > বোঝাইচিস, ইত্যাদি।
- বাংলাদেশের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়া বাকি সব জেলাতে চ, ছ-কে স [s] এবং জ, ঝ-কে বঙ্গালীর মত জ় [z] উচ্চারণ করে। তবে ‘জ’-কে মাঝেমধ্যে জ় [z] বরেন্দ্রীর সবস্থানেই উচ্চারিত হয়।
- বেশিরভাগ অঞ্চলে ভবিষ্যত কালের উত্তম পুরুষের ক্রিয়াপদে ‘(ই)বো’ বিভক্তি হয়। যেমন — করব, চাইব, যাব, ইত্যাদি। তবে স্থানভেদে বহু অঞ্চলে 'মো' বিভক্তির ব্যবহার দেখা যায়। যেমন — করমো, যামো, আসমো, ইত্যাদি।
তুলনা
[সম্পাদনা]“আজকে নদীতে অনেক পানি বেড়েছে আর খুব স্রোতও আছে“ = আজকে লদ্দীতে ম্যালায় পানি বাইড়্যাছে আর খুব সোঁতও আছে।
“তুমি কোথায় যাচ্ছো?“ = তুমি কোথি/কুন্ঠে যাইচ্ছো?
“আমি বাড়িতে গেলাম কাল আবার আসবো” = আমি/হামি বাড়িতে গেনু কাল ফের আসবো/আসমো।
নিচে বরেন্দ্রী উপভাষা এবং তাদের উপভাষাগুলির মধ্যে তুলনা দেওয়া হল:
চলিত বাংলা: একজন ব্যক্তির দুটি পুত্র/ছেলে ছিল।
সাধু বাংলা: কোন মানবের দুইটি পুত্রের অস্তিত্ব থাকিলো।
- রাজশাহী : একজন মানষের দুইটা ব্যাটা/ছাওয়াল ছিল।
- নওগাঁ : একজ়নের দুটা ব্যাটা/সোয়েল সিল।
- নাটোর : একজন মানুষের দুটা বেটা/ছোওয়াল ছিল।
- সাপাহার : একজ়ুন মানুষির দুটা বেটা/সোওয়াল সিল।
- দক্ষিণ দিনাজপুর : একজ়নের দুটা বেটা/ছওৱা(বা)ল ছিল।
- মালদা : একঝন মানুসের দুইটা ব্যাটা/ছাওয়াল ছিলো।
- চাঁপাইনবাবগঞ্জ : একঝন মাইনশের দুটা ব্যাটা/ছাওয়াল আছিলো।
- রায়গঞ্জ : একঝন মানুসার দুটো বেটা/ছোওয়াল ছিল।
- শেরশাবাদিয়া : একঝন বেক্তির দুইটি ব্যাটা/সাওয়াল সিল।
- সাহেবগঞ্জ : একজ়ন বেক্তির দুটা বেটা সিলো।
- বগুড়া : একঝনের দুই ব্যাটা/ছোইল আছিল।
- জয়পুরহাট : একজ়ন মানষের দুইকনা ব্যাটা/সাওয়াল/সোল সিল।
- হাকিমপুর : একঝন দুইয়া ব্যাটা/ছোইল আছিল।
- ধামইরহাট : একজ়ৈন দুইয়া ব্যাটা/সাওয়োল আসিল।
- গোবিন্দগঞ্জ : এক বেক্তির দুটা ব্যাটা/সোল আসিল।
- মুর্শিদাবাদ : কোনো লোকের দুটা সেলে/সোবাল সিল।
- বহরমপুর : কুনো লোকের দুটো সেলে সিল।
- জঙ্গীপুর : কোনো এক লোকার দুইটা সোওয়াল আসিলো।
- কান্দি : কোনো ব্যক্তির দুটো ছোৱাল আছিলো।
- ডোমকল : কোনো মানুষির দুটা ছেইলে/ছাওয়াল ছিল।
- দিনাজপুর (দিনাজপুর সদর উপজেলা ও সীমান্ত অঞ্চল) : একজ়ন মানশের দুই ব্যাটা/ছাওয়াল ছিল।
- পূর্ব পূর্ণিয়া (শিরিপুরিয়া) : একঝনার দুই ছাওয়াল ছিল্।
ধ্বনিব্যবস্থা
[সম্পাদনা]এখানে ঘৃষ্টধ্বনিগুলো পশ্চিমবঙ্গের কিছু জ়েলা আর বাংলাদেশের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়া সব জেলায় একই বঙ্গালী উপভাষার মতো উচ্চারিত হয়। সব জেলায় এরকম করে উচ্চারণ করা হয়।
| সম্মুখ | কেন্দ্রীয় | পশ্চাৎ | |
|---|---|---|---|
| সংবৃত | ই~ঈ i | উ~ঊ u | |
| সংবৃত-মধ্য | এ | ও | |
| বিবৃত-মধ্য | (অ্যা) (æ) | অ ɔ | |
| বিবৃত | আ ä~ɐ |
| সম্মুখ | কেন্দ্রীয় | পশ্চাৎ | |
|---|---|---|---|
| সংবৃত | ইঁ~ঈঁ ĩ |
উঁ~ঊঁ ũ | |
| সংবৃত-মধ্য | এঁ ẽ | ওঁ õ | |
| বিবৃত-মধ্য | (অ্যাঁ) (æ̃) | (অঁ) (ɔ̃) | |
| বিবৃত | আঁ ɑ̃ |
| ওষ্ঠ্য | দন্ত্য | দন্তমূলীয় | তালু-দন্তমূলীয়/দন্তমূলীয় | তালু-দন্তমূলীয়/তালব্য | পশ্চাত্তালব্য | কণ্ঠনালীয় | |||
|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|
| নাসিক্য | ম m | ন n | ঙ ŋ | ||||||
| স্পর্শ | অঘোষ | অল্পপ্রাণ | প p | ত t̪ | ট t̠ | চ tɕ~tʃ | ক k | ||
| মহাপ্রাণ | ফ pʰ | থ t̪ʰ | ঠ t̠ʰ | ছ tɕʰ~tʃʰ | খ kʰ | ||||
| ঘোষ | অল্পপ্রাণ | ব b | দ d̪ | ড d̠ | জ dʑ~dʒ | গ ɡ ঘ gʱ | |||
| মহাপ্রাণ | ভ bʱ | ধ d̪ʱ | ঢ d̠ʱ | ঝ dʑʱ~dʒʱ | |||||
| উষ্ম | অঘোষ | ফ় (f) | স s | শ (ʃ) | হ h~ɦ | ||||
| ঘোষ | |||||||||
| নৈকট্য | ল l~l̠ | য় (j) | |||||||
| তাড়ন | অল্পপ্রাণ | র ɹ~ɾ | ড় ɾ̠ | ||||||
| মহাপ্রাণ | ঢ় ɾ̠ʱ | ||||||||
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ হ্যামারস্ট্রোম, হারাল্ড; ফোরকেল, রবার্ট; হাস্পেলম্যাথ, মার্টিন, সম্পাদকগণ (২০১৭)। "Northern Bengali"। গ্লোটোলগ ৩.০ (ইংরেজি ভাষায়)। জেনা, জার্মানি: মানব ইতিহাস বিজ্ঞানের জন্য ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট।
- ↑ হ্যামারস্ট্রোম, হারাল্ড; ফোরকেল, রবার্ট; হাস্পেলম্যাথ, মার্টিন, সম্পাদকগণ (২০১৭)। "Rajshahi"। গ্লোটোলগ ৩.০ (ইংরেজি ভাষায়)। জেনা, জার্মানি: মানব ইতিহাস বিজ্ঞানের জন্য ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট।
- ↑ "রাজশাহীর আঞ্চলিক ভাষায় ধারাবাহিক"। ৮ আগস্ট ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৫ আগস্ট ২০১৮।
- ↑ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ১৯৩৯
- ↑ SK Chatterji, The Origin and Development of the Bengali Language, Calcutta University, Calcutta, 1926; CP Masica, The Indo-Aryan Languages, Cambridge University Press, Cambridge, 1991.